
গণভোটে “হ্যাঁ” এর পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারী কর্মকর্তাদের সামনে কোনও আইনগত বাধা নেই বলে সাফ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট বিষয়ক প্রচার কার্যক্রমের মূখ্য সমন্বয়ক প্রফেসর আলী রীয়াজ। তিনি বলেন,জুলাইতে যারা রক্ত দিয়েছেন, যাদের বেওয়ারিশ লাশ এখনো খুঁজে ফিরছেন তাদের স্বজনরা, তারা শুধু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ এই গনভোট। বিদ্যমান সংবিধান, আরপিও, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কিংবা এই গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশের কোথাও বলা নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। প্রচারণায় আইনগত বাধা আছে এমন কোনো রেফারেন্স কেউ দেখাতে পারবে না। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা নৈতিকভাবে গণভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্ন যারা তুলছেন তাদের উদ্দেশ্যে আলী রীয়াজ পালটা প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা কোন নৈতিকতার কথা বলছেন- যে নৈতিকতা তাজা তরুণদের রক্তকে, তাদের আত্মদানকে অস্বীকার করে?’
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিবেচনা করে তাদের এমন দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বিশেষ সহকারী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বৈধতা, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই অন্তর্বর্তী সরকার। এটা মোটেই কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে-সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। নির্বাচন সরকার আয়োজন করে না; অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে সরকার, আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচারও আদালত পরিচালনা করবে, সরকার শুধু বিচার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করছে। তাই সরকারের মূল ম্যান্ডেটই হলো রাষ্ট্র সংস্কার।
অনেকে দাবি করেন এমন গণভোট এর আগে কোথাও হয়নি উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, এর আগে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৪৮ টি গণভোট হয়েছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। সুতরাং আন্তর্জাতিকভাবে এটা গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, নৈতিকভাবে এটা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব এবং আইনগত ভাবে এতে কোনো বাধা নেই, তিনি বলেন। গণভোটে এত প্রশ্ন, এত বিষয়, সেটা সাধারণ মানুষ বুঝবেন না- এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে আলী রিয়াজ বলেন, ‘সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে পারবেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান করতে পারবেন কিন্তু মানুষের অধিকারের প্রশ্ন আসলে সেটা জনগণ বুঝবেন না- আমি তার সাথে একমত নই।’ তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে মানুষকে অসম্মান আর হেয় করা হচ্ছে।
বিগত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাঁতাকলে যারা পিষ্ট হয়েছেন, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, জেল–জুলুম–নিপীড়ন সহ্য করেছেন, গুমের শিকার হয়েছেন, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তারা আমাদের হাতে একটা দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আলী রীয়াজ বলেন, এই দায়িত্ব হলো, আগামী দিনে বাংলাদেশ যেন একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নীত হতে পারে তার জন্য যেন আমরা দায়িত্ব পালন করি। ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য যে কমিটি তৈরি করেছিল, সেই কমিটি ২৫টি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে কিছু পরিবর্তনসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অব্যাহত থাকবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কমিটির একটি মাত্র বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটা বাতিল হয়ে যায় একজন মাত্র ব্যক্তির ইচ্ছায়।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন, কর্ম কমিশন অথবা বিচারপতি নিয়োগ রাষ্ট্রপতির করার কথা থাকলেও বাস্তবে এর সবকিছুই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে হয়। প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী বলেন, একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব আর সংবিধান নিয়ে এই ছেলেখেলা বন্ধ করার জন্যই জুলাই সনদ এবং গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, আগের ফ্যাসিবাদী শাসকের আর ফেরার সম্ভাবনা নেই কিন্তু ফ্যাসিবাদ ফেরার সম্ভাবনা আছে যদি আমরা রাস্তা বন্ধ না করি। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে অনেক বাবা- মায়ের সন্তান প্রাণ হারিয়েছে। আগামীবার যদি ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে তাহলে আমার আপনার সন্তানের প্রাণ যেতে পারে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার এই চক্রকে ভেংগে দিতেই এবারের গণভোট হচ্ছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যে প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই কিন্ত এই গনভোট। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মুক্তিযুদ্ধের যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল, পরবর্তীকালে সেই উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যের কথা সংবিধানের মূলনীতিতে আর রাখা হয়নি। ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায় বিচার তথা ইনসাফ, স্বাধীনতার এই ৫৪ বছর পরও আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
এবারের গণভোট স্বাধীনতার সেই মূল চেতনার আলোকে দেশ গড়ার পথে একটি সুবর্ণ সুযোগ উল্লেখ করে মনির হায়দার এই সুযোগ সবাই যেন কাজে লাগাতে পারে সে লক্ষ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় সিলেট বিভাগের জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাগণ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং এনজিও প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
পাঠক সংখ্যাঃ ৯০
0Shares
