বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ হবে দেশ পুনর্গঠন

খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে প্রভাতী স্কুল মাঠে মহানগর ও জেলা বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “আজকে বাংলাদেশের তাবৎ মা বোনদেরকে বলব আমি, যারা আপনাদেরকে এভাবে অপমানিত করে, তাদেরকে আপনারা কীভাবে জবাব দেবেন, আজ সেই সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। যাদের কাছে মানুষের ‘মূল্যায়ন নেই’, তাদের কাছে দেশ কখনো ‘নিরাপদ হতে পারে না’। “আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আজকে নির্বাচনে যদি তারা কোনোভাবে সুযোগ পায়, নির্বাচন পরবর্তী সময় তাহলে তাদের আচরণ কী হতে পারে?”

জামাতের আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ‘নারী বিদ্বেষী’ পোস্ট ঘিরে উত্তাপের মধ্যে সোমবার দুপুরে খুলনার খালিশপুরের প্রভাতি স্কুল মাঠে এক নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যানের এ বক্তব্য আসে। যে দলটি নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অসম্মানজনকভাবে কথা বলে, তাহলে আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আজকে নির্বাচনে যদি তারা কোনোভাবে সুযোগ পায়, নির্বাচন পরবর্তী সময় তাহলে তাদের আচরণ কী হতে পারে? নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন জবাব দেওয়ার সময় এসেছে দেশের নারীদেরই। বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে পরিবার ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন এরা শুধু নিজের স্বার্থের কথা বোঝে। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। যেখানে প্রয়োজন সেখানে তারা তাদের মতন করে ধর্মকে ব্যবহার করে। কেবল কথায় নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান এবং বেকারত্ব হ্রাসের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। দীর্ঘদিন আন্দোলনের পথে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হলেও দলটি হাল ছাড়েনি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গত ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পায়নি। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা গেছে। যারা অধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, তাদের অনেককেই গুম ও হত্যার মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। আগামী ১২ তারিখে বঞ্চিত জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজ হবে দেশ পুনর্গঠন। এ জন্য দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী—এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। এজন্য অতীতে বিএনপি বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। একটি রাজনৈতিক দল নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখতে চায় এবং তারা নারী নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না। সম্প্রতি ওই দলের এক শীর্ষ নেতার নারীদের নিয়ে করা মন্তব্য দেশের মা-বোনদের জন্য কলঙ্কজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ নারী সংসারের অর্থনৈতিক চাপে কাজ করছেন—গার্মেন্টস শিল্পে যুক্ত ৫০ লাখের বেশি নারীসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা শ্রম দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। অথচ এই কর্মজীবী নারীদের নিয়েই অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্ত্রী হযরত বিবি খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ টেনে বলেন, তিনিও একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ছিলেন। যারা ধর্মের কথা বলে নারী সমাজকে অপমান করে, তারা আসলে ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচনের আগেই যারা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখতে চায়, তারা ক্ষমতায় গেলে নারীদের সঙ্গে কী করবে—সে প্রশ্ন দেশবাসীর সামনে উঠে আসে। অতীতে ১৯৭১ সালেও তারা নারীদের সঙ্গে কী করেছে, তা জাতি দেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, গ্যাসসহ নানা সমস্যার কারণে অঞ্চলটি আজ মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে খুলনাকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য আইটি পার্ক স্থাপন এবং কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালুর ঘোষণা দেন তিনি। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে বীজ ও সার সুবিধার পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের ব্যবস্থার কথাও জানান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, আর ২০২৪ সালে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করেছে দেশের ছাত্র-জনতা। তখন কেউ ধর্ম-বর্ণ দেখেনি, সবাই একত্রিত হয়ে লড়াই করেছে। বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে সব ধর্মের মানুষ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।

ভোট গণনা নিয়ে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগের বঞ্চিত অধিকার যেন আর কেউ কেড়ে নিতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি বিষয় সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। অতীতে বিএনপি দেশকে ভয়াবহ সংকট থেকে উদ্ধার করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শেষে ভোট প্রার্থনা করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জনগণের জন্য ও দেশের জন্য রাজনীতি করে। তাই আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় খুলনা বিভাগের ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের হাতে ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া হলো—তাদের বিজয়ী করুন, তারাই পরে আপনাদের খোঁজ নেবে।

0Shares

নিউজ খুজুন