দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রুড অয়েলের স্বল্পতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। সুতরাং লো-ফিডে ইআরএল চালু থাকলেও এর কোনো বিরূপ প্রভাব সরবরাহ চ্যানেলে পড়বে না এবং এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
সচিবালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এসব কথা বলেন।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ইআরএল-এর মোট ইউনিটের সংখ্যা ৪টি। তন্মধ্যে ২টি ইউনিট বর্তমানে মেইনটেন্যান্সে এবং ২টি অপারেশনে আছে। বাংলাদেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি মূলত সৌদি আরামকো হতে Arabian Light Cruide Oil (ALC) এবং আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ADNOC হতে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানিপূর্বক পরিশোধন করে দেশের মোট বাৎসরিক জ্বালানি তেলের চাহিদার ৫ ভাগের ১ ভাগ সরবরাহ করা হয়, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ১৫ লাখ মে. টন। বছরের শুরুতে নেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি মাসে সাধারণত ১/২টি কার্গো আমদানিপূর্বক ইআরএল উৎপাদন অব্যাহত রাখে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী অবশিষ্ট জ্বালানি তেল পরিশোধিত আকারে আমদানি করা হয়।
উল্লেখ্য, দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ব্যবহৃত ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের তুলনামূলক চিত্র থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে দেশের জ্বালানির মোট চাহিদার কত শতাংশ ইআরএল থেকে পাওয়া যায়। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা (বিক্রয়) ছিল ৪৭ লাখ ৪২ হাজার মেট্রিক টন তার মধ্যে ইআরএল থেকে পাওয়া গেছে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ ( ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ); অকটেন-এর চাহিদা ৪ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন, ইআরএল থেকে প্রাপ্তি শূন্য এবং পেট্রোল এর চাহিদা ৪ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন ইআরএল থেকে পাওয়া গেছে ৫৮ লাখ ৩০৯ হাজার ( ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ)।
এর বাইরে ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন ও বিটুমিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উপজাত হিসেবে ইআরএল থেকে পাওয়া যায়। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, দেশের মূল জ্বালানি তেল ডিজেলের মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পেট্রোলের ১১ শতাংশ ইআরএল থেকে পাওয়া যায়। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করে একদিকে ইআরএল থেকে প্রাপ্ত তেলের ঘাটতি যথাযথভাবে পূরণ করছে এবং অন্যদিকে সীমিত পর্যায়ে ইআরএল’র উৎপাদনও অব্যাহত রেখেছে।
এবছর ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় মার্চ (২ লাখ মেট্রিক টন) এবং এপ্রিলের (১ লাখ মেট্রিক টন) নির্ধারিত ৩ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানির যে শিডিউল সে অনুযায়ী ক্রুড অয়েল আনা সম্ভব হয়নি।
শিডিউল অনুযায়ী ক্রুড অয়েল আমদানির বর্তমান চিত্র নিম্নরূপ:
মার্চ ২০২৬ মাসের প্রথম পার্সেল এরাবিয়ান লাইট ক্রড এর (এএলসি) ১ লাখ মেট্রিক টনের কার্গোটি (MT Nordic Pollux-IMO No-9239848) লোড সম্পন্ন হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় হরমুজ অতিক্রম করতে পারেনি। এটি বর্তমানে রাস্তানুরা বন্দরে অবস্থান করছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
মার্চ ২০২৬ এর দ্বিতীয় পার্সেলটি (মারবান) লোডিংয়ের জন্য নির্ধারিত পোর্ট হরমুজ প্রণালীর অভ্যন্তরে থাকার কারণে (১ লাখ মেট্রিক টন) ইতোমধ্যে সরবরাহকারী কর্তৃক ফোর্স ম্যাজিউর করা হয়েছে।
তবে, এপ্রিল ২০২৬-এ নির্ধারিত (১ লাখ মেট্রিক টন) ১টি এরাবিয়ান লাইট ক্রুডের কার্গো ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে লোডিং সম্পন্ন করে ২/৩ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে বিকল্প বন্দর ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে। মে ২০২৬-এ ১টি (১ লাখ মেট্রিক টন) মারবান কার্গোর পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ১টি (১ লাখ মেট্রিক টন) এএলসি কার্গোর জন্য সৌদি আরামকোকে অনুরোধ করা হয়েছে। যা সরবরাহকারীর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। এছাড়া, জরুরি চাহিদা পূরণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানির জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন গ্রহণপূর্বক কার্যাদেশ জারি করা হয়েছে। মার্চ ২০২৬ শিডিউলের ক্রুড অয়েল পার্সেল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারায় বর্তমানে ইআরএল লো-ফিডে চালু রাখা হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সরকার সিডিউল অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করছে এবং নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, দেশে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। ১৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বর্তমানে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন ডিজেল, ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন পেট্রোল, ৩২ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুত আছে। উল্লেখ্য, পাইপ লাইনে প্রায় ২ মাসের জ্বালানি আছে যা দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে। তিনি আরো জানান, বর্তমানে ঢাকার ৭টি ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাস অ্যাপের মাধ্যমে মোটর বাইকে পরীক্ষামূলক জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে আরো ৭টি পাম্প যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। এ যাবত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে।