সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি এনসিপির

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আফিস মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

বৈঠক পরবর্তী আফিস মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের যেই ৪৫টা আসনে আমরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি এবং এর বাইরেও আরও যে যে জায়গায় নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে, সেগুলো নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এসব বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ, বিধিপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যেহেতু সামনে শুনানি আছে, সেই শুনানিতে যেন এ ধরনের কোনো প্রেফারেন্স এবং একতরফা কিছু না দেখা যায় সে বিষয়ে আজকে কথা বলতে এসেছি। আমি যদি দুইটা উদাহরণ দেই, জাতীয় নাগরিক পার্টির দুইজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে, যেমন কুমিল্লা-৪ সংসদীয় আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রার্থী হিসেবে আছেন।

বিএনপির যিনি প্রার্থী তিনি তার প্রায় শত কোটি টাকার উপরে ঋণ খেলাপির তথ্য গোপন করেছেন। যদিও তিনি হাইকোর্ট থেকে সে বিষয়ে অর্ডার বাংলাদেশ ব্যাংকে দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে দেওেয়া তার হলফনামায় সেই তথ্য তুলে ধরা হয়নি। যেটা স্পষ্টই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও আমরা দেখলাম যে, তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সিলেট-১ আসনে আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে এতেশাম হক মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তার দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যে তথ্য রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অনুরোধ করেছিলেন যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তিনি পরবর্তীতে দাখিল করবেন। এরপরও তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ একই জেলায় আমরা দেখেছি, সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তার কাগজপত্র পরবর্তীতে দাখিলের শর্তে তার মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সিলেট জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক পুরো বিষয়টি অবগত ছিলেন। একই ধরনের পরিস্থিতিতে দুইজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে দুই রকম সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে—একজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, অন্যজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এটি স্পষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসনের একতরফা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের পরিচয় বহন করে। এগুলো আমাদের দুটি নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং এর বাইরেও অন্তত আরও একশটি উদাহরণ রয়েছে। আমার নিজ জন্মস্থানের কথা বলি, সেখানে আমরা দেখলাম বিএনপির যিনি প্রার্থী, তিনি ঋণ খেলাপির কথা উল্লেখ করেননি হলফনামায়। ১৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আছে এবং একই সাথে তিনি তুরস্কের নাগরিক। আমরা তার সেই আইডি কার্ডও ঘুরতে দেখছি সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই দুইটা স্পষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং প্রার্থিতা বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে।

বড় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নির্বাচন কমিশনের কোনো ধরনের দুর্বলতা আমরা দেখতে চাই না। যদি সে ধরনের পরিস্থিতি আমরা দেখি, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা সামনে এসেছে, যার জন্য এত মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনো আমাদের অনেক ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়ে আছেন। তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা— যেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসবে, যে গণতান্ত্রিক সরকার আমরা বিগত ১৭ বছর দেখিনি, যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। সরকার বা রাজনৈতিক দল যে কোনো পক্ষ এই সম্ভাবনাকে নষ্ট করার কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় এবং যদি আমরা আবারও পুরোনো কোনো সেটেলমেন্টের মধ্য দিয়ে, কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করার লক্ষণ দেখি, তাহলে আমরা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বসে থাকব না। প্রয়োজনে আমরা আবার রাজপথে নামব। প্রয়োজনে আমরা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং জনগণের রায় দেওয়ার অধিকার ছিনিয়ে নেব।

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বিগত কিছুদিন আগে একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন দেশে এসেছেন। আমরা অবশ্যই তাকে আমাদের দলের পক্ষ থেকে, পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও স্বাগত জানিয়েছি। কিন্তু এর পরপরই যা ঘটেছে, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা একটি নির্দিষ্ট দলীয় কার্যালয়ের দিকে কার্যত তাদের ‘কেবলা’ ঠিক করে ফেলেছেন। তারা সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করছেন।

আমরা মনে করি, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। বিগত সময়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে যে ধরনের অনিয়ম ও অসদাচরণ আমরা দেখেছি, সেগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এ ধরনের ধৃষ্টতা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। আমরা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাব, যেসব সরকারি কর্মকর্তা সেখানে গিয়েছেন, তারা স্পষ্টভাবে সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষের আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ ও উৎসাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তাতে ভাটা পড়েছে।

তাই আমরা জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি, যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে জনগণ আবারও রাজপথে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে নামতে বাধ্য হবে, যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।

0Shares

নিউজ খুজুন